আমরা সবাই দৌড়ে চলেছি। কেউ দৌড়াচ্ছে ভালো রেজাল্টের জন্য, কেউ চাকরির জন্য, কেউবা ব্যবসার জন্য। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সবাই খুব ব্যস্ত, সবাই কিছু না কিছু অর্জন করছে। কিন্তু রাতের বেলা যখন বিছানায় শুয়ে থাকি, তখন মনের গভীরে একটা প্রশ্ন আমাদের কুরে কুরে খায়—এই সব কিছুর মানে কী? আমি আসলে কিসের জন্য বাঁচছি? আমার জীবনের উদ্দেশ্য আসলে কী?
এই প্রশ্নটাই একজন মানুষের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। কারণ লাইফে অর্থ খুঁজে পাওয়া মানেই নতুনভাবে বাঁচা শুরু করা। আর যেদিন একজন মানুষ বুঝে ফেলে তার বেঁচে থাকার আসল মানেটা কী—সেদিন থেকেই তার কাজ, পড়াশোনা, ব্যবসা, এমনকি সম্পর্কের মানসিকতাও পুরোপুরি বদলে যায়।
- লাইফের মিনিং কোথায় হারায়?
ছাত্রজীবন থেকেই আমরা যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতার ভেতরে আটকে যাই। পড়াশোনা মানে শুধু ভালো রেজাল্ট করা। কেউ যদি বলে, “আমি পড়াশোনা করছি কারণ আমি শিখতে চাই,” তখন অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। অথচ শেখার আনন্দটাই পড়াশোনার আসল মানে। কিন্তু আমরা সেটা হারিয়ে ফেলি।
কর্পোরেট লাইফে প্রবেশ করলেই জীবনটা যেন আরও কঠিন হয়ে যায়। প্রতিদিন সকালে উঠে অফিস, মিটিং, টার্গেট, KPI—এই একঘেয়ে চক্রের ভেতর মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায় সে আসলে কী চায়। বেতন আসে, পদোন্নতি আসে, কিন্তু ভেতরে একটা শূন্যতা থেকেই যায়।
উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও একই গল্প। অনেকে ব্যবসা শুরু করেন স্বাধীনতা আর স্বপ্নের খোঁজে, কিন্তু ধীরে ধীরে তারাও শুধু প্রফিট, রেভিনিউ আর মার্কেট শেয়ারের মধ্যে আটকে যান। একসময় টাকাও আসে, সাফল্যও আসে, কিন্তু মনে হয় কিছু একটা যেন মিসিং।
আমাদের সবার কমন ভুল হলো—আমরা জীবনের মানে শুধু টাকায় মাপতে চাই। অথচ টাকার বাইরেও জীবন আছে, আর সেটাই আসল জীবন।
- টার্নিং পয়েন্ট – যখন মানুষ প্রশ্ন করে “আমার উদ্দেশ্য কী?”
প্রতিটি সফল মানুষের জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট থাকে, যখন সে নিজের কাছে কঠিন প্রশ্ন করে—“আমি আসলে কেন এটা করছি?”
স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, “মৃত্যুর কথা মনে করলেই আমি বুঝতে পারি, আমি আসলে কী করতে চাই।” জ্যাক মা তার প্রথম দিকের ব্যর্থতা নিয়ে হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, “আমি টাকার জন্য নয়, মানুষের জীবন সহজ করার জন্য আলিবাবা বানিয়েছি।”
এই টার্নিং পয়েন্ট সাধারণত ব্যর্থতার সময় আসে। যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে, তখনই মানুষ ভাবে—আমি আসলে কী চাই? ব্যর্থতা মানুষের চোখ খুলে দেয়, তাকে নতুন দিক দেখায়। তখনই জন্ম হয় নতুন মাইন্ডসেটের। আর এই মাইন্ডসেট মানুষকে শেখায়, জীবনের অর্থ কখনোই শুধু টাকা বা সাফল্য নয়, বরং ভ্যালু তৈরি করা, অন্যদের সাহায্য করা আর নিজের স্বপ্ন পূরণ করা।
- উদ্যোক্তাদের জন্য লাইফের মিনিং
একজন উদ্যোক্তার আসল সফলতা শুধু টাকা বানানো নয়, বরং মানুষের সমস্যার সমাধান করা। এলন মাস্ক যদি শুধু প্রফিট চাইতেন, তাহলে তিনি কখনো মহাকাশে রকেট পাঠানোর ঝুঁকি নিতেন না। তিনি চেয়েছিলেন মানবজাতিকে একদিন অন্য গ্রহে পৌঁছে দিতে। এটাই তার কাছে লাইফের অর্থ।
বাংলাদেশেও অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা শুধু ব্যবসা করছেন না, মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছেন। কেউ দরিদ্র মানুষকে কাজের সুযোগ দিচ্ছেন, কেউ শিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছেন। তাদের ব্যবসা তাদের কাছে শুধু টাকা নয়, বরং একটা মিশন।
একজন উদ্যোক্তার জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের মিশন, ভিশন আর কনট্রিবিউশনকে ঠিক করে নেওয়া। কারণ এগুলোই তার ব্যবসাকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। টাকা আসবেই, কিন্তু টাকার সাথে যদি মানুষের ভালোবাসা আর সমাজে অবদান থাকে, তবে সেটাই আসল সাফল্য।
- কর্পোরেট লাইফে থাকা মানুষের জন্য
অনেকে ভাবে কর্পোরেট লাইফ মানেই একঘেয়ে জীবন। কিন্তু সত্যি কথা হলো, জবকেও অর্থপূর্ণ করা যায়।
ধরা যাক, একজন কর্মী অফিসে শুধু বেতন পাওয়ার জন্য কাজ করছে। আরেকজন কর্মী একই কাজ করছে, কিন্তু সে দেখছে তার কাজের মাধ্যমে কাস্টমার খুশি হচ্ছে, টিম গ্রো করছে, কোম্পানি এগিয়ে যাচ্ছে। দুইজনেরই বেতন সমান, কিন্তু দ্বিতীয়জনের জীবন অনেক বেশি অর্থপূর্ণ।
কর্পোরেট লাইফে অর্থ খুঁজে পেতে হলে কাজকে শুধু দায়িত্ব মনে না করে শেখার সুযোগ মনে করতে হবে। পাশাপাশি সাইড প্রজেক্ট, নতুন স্কিল শেখা বা নিজের আগ্রহের কোনো কাজে সময় দেওয়াও জরুরি। এই ছোট ছোট কাজগুলো একসময় বড় প্রভাব ফেলে।
- স্টুডেন্টদের জন্য
ছাত্রজীবন হলো সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্টের সময়। কিন্তু আমরা প্রায়ই এটাকে শুধু পরীক্ষায় নাম্বার তোলার খেলা মনে করি। অথচ আসল অর্থ হলো জ্ঞান অর্জন করা, নিজের স্কিল ডেভেলপ করা এবং প্যাশন খুঁজে বের করা।
ধরা যাক, একজন ছাত্র প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট ইংরেজি বই পড়ে। প্রথমে হয়তো তেমন পার্থক্য বোঝা যাবে না, কিন্তু এক বছর পর তার ইংরেজি হবে অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো। আর পাঁচ বছর পর সে হয়তো একজন দুর্দান্ত স্পিকার হয়ে যাবে।
এটাই হলো কমপাউন্ডিং ইফেক্ট। ছোট ছোট ভালো অভ্যাস একদিন জমে বিশাল ফলাফল তৈরি করে। স্টুডেন্ট যদি প্রতিদিন সামান্য করে পড়াশোনা, স্কিল ডেভেলপ আর এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যায়, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই তার জীবন বদলে যাবে।
- লাইফের অর্থ খুঁজে পাওয়ার Universal Formula
লাইফের আসল মিনিং খুঁজে পেতে তিনটি জিনিস লাগে—Passion, Skill আর Contribution।
Passion হলো তুমি কোন কাজ ভালোবাসো।
Skill হলো তুমি কোন কাজে ভালো।
Contribution হলো তুমি কিভাবে অন্যদের জীবনে ভ্যালু আনছো।
এই তিনটাকে একসাথে করলে তৈরি হয় Ikigai—যেটাই আসলে জীবনের আসল মানে।
এখানেই আবার আসে কমপাউন্ডিং ইফেক্ট। প্রতিদিন ছোট ছোট কাজ—এক পৃষ্ঠা পড়া, এক নতুন আইডিয়া টেস্ট করা, এক নতুন মানুষের সাথে কানেক্ট হওয়া—এগুলো হয়তো সামান্য মনে হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখবে এগুলোই তোমার লাইফকে অন্যরকম করে দিয়েছে।
উদাহরণ দিই—একজন সাধারণ ছেলে প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট লেখালেখি করতো। কয়েক বছর পর সে হয়ে গেল সফল লেখক। একজন মেয়ের স্বপ্ন ছিল ব্যবসা করা। সে প্রতিদিন সামান্য করে শিখতে লাগলো, একদিন সেই ছোট শেখাগুলোই তাকে বড় উদ্যোক্তা বানিয়ে দিল।
অর্থাৎ লাইফের অর্থ খোঁজা মানে কোনো একদিন হঠাৎ বড় কিছু করে ফেলা নয়। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে অর্থ খুঁজে পাওয়া, আর সেই কাজগুলোকে জমতে দেওয়া—এটাই আসল রহস্য।
- লাইফে Meaning থাকলে কি পরিবর্তন আসে?
যখন একজন মানুষ জানে সে কেন বাঁচছে, তখন তার ভেতরে অসাধারণ মোটিভেশন জন্মায়। তার কাজ তখন শুধু কাজ থাকে না, বরং মিশন হয়ে যায়। স্ট্রেস কমে যায়, মন শান্ত হয়। অন্যদের সাথে সম্পর্ক উন্নত হয়, কারণ সে জানে সে কাকে সাহায্য করছে।
দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যও তখন অনেক বড় হয়। কারণ টাকা, খ্যাতি, সুখ—সব একসাথে আসে। আর তখন মানুষ শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও বাঁচতে শেখে।
উপসংহার
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো—আপনি কি আপনার লাইফের মিনিং খুঁজে পেয়েছেন? যদি না পেয়ে থাকেন, তবে আজই নিজের কাছে তিনটি প্রশ্ন করুন:
আমি কে?
আমি কী চাই?
আমি কিভাবে অন্যদের লাইফে ভ্যালু আনতে পারি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই আপনি দেখবেন, আপনার জীবন শুধু অর্থপূর্ণই নয়, বরং অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। আর তখনই আপনি বুঝবেন—লাইফের আসল মিনিং শুধু নিজের সাফল্যে নয়, বরং অন্যদের জীবনে আলো ছড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

